৫৫/বি (৩য় তলা), পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০

ফোন : ০২-৯৫৬৭১৩০, ফ্যাক্স : ০২-৭১৬১০৮০

মাওলানা সৈয়দ মুহাম্মাদ ফজলুল করীম (রহ.)

তাজদীদে দ্বীন ও পীর সাহেব চরমোনাই রহ.

 

ভূমিকা
মানব সমাজ সদা প্রবাহমান ও নিত্য পরিবর্তনশীল। প্রতিটি নতুন দিন মানুষের মাঝে নতুন বোধ সৃষ্টি করে। প্রতি বর্গ মিটারের দূরত্ব মানুষের মাঝে ভিন্নতা এনে দেয়। সে জন্যই বিশ্বব্যাপী একই ভাষা, একই সংস্কৃতি ও একই বোধ বিদ্যমান থাকা সম্ভব না। বিশ্বব্যাপী হাজার হাজার ভাষা, সংস্কৃতি ও আচরণ সমষ্টি নিয়েই পৃথিবী এবং এটাই মানব সভ্যতার সৌন্দর্য।

 

সময় মানুষকে এবং মানব সভ্যতার সকল কিছুই বদলে দেয়। একক কাঠামোবদ্ধ, সুসংহত এবং প্রতিনিয়ত চর্চিত ভাষাও সময়ের ব্যবধানে বদলে যায়। ১৭-১৮ শতকের ইংরেজিভাষা আর আজকের ইংরেজিভাষা এক জিনিস নয়। বাংলার ক্ষেত্রেও তাই। গত শতকের বাংলাভাষা থেকে আজকের বাংলাভাষা অনেক ব্যবধান। আর যদি হাজার খানেক বছর পেছনে যাওয়া যায় তাহলে তৎকালীন বাংলা-ইংরেজির সাথে আজকের বাংলা-ইংরেজির মিল খুজে বের করতে গবেষক হতে হবে।

 

মানুষের মূল্যবোধ-চিন্তাধারাও সময় ও স্থানের পরিবর্তনের সাথে বদলে যায়। এক কথায় মানবমন, মানব সমাজ, সভ্যতা, চিন্তা-মুল্যবোধ, আচরণ এবং শ্রদ্ধা-ভক্তি নিবেদনের স্থান ও আচাররীতি নিত্য পরিবর্তনশীল, সদা প্রবাহমান, চিরগতিশীল এবং নিত্য নতুন। গোটা মানব সভ্যতার ইতিহাস তন্যতন্য করে খুঁজেও এমন একটা নিদর্শন পাওয়া যাবে না যা সময়ের, স্থানের ও ব্যক্তির পরিবর্তনে অপরিবর্তনীয় ছিলো।

 

মানব সভ্যতার এই চির পরিবর্তনশীলতা, প্রবাহমানতা, গতিশীলতার চিরন্তন বাস্তবতার মাঝেও বিষ্ময়কর ব্যতিক্রম হলো “ইসলাম”। আশ্চর্যজনকভাবে ইসলাম বিগত ১৪০০ বছর ধরে নিত্য পরিবর্তনশীল মানব সভ্যতায় হাজারো বৈচিত্রে বৈচিত্রময় বিশ্বের নানা প্রান্তের মানুষের জীবনে সম্পূর্ণ অবিকৃত রূপে চর্চিত হয়ে আসছে। সাড়ে ১৪০০ বছর ধরে কালের অপ্রতিরোধ্য পরিবর্তনকামীতার মাঝেও ইসলাম সম্পূর্ণ অপরিবর্তিত রয়েছে। স্থানের ভিন্নতা ও মানুষের ভিন্নতার কারনে সৃষ্ট চিরন্তর রুপান্তরের সুনামীর মাঝেও ইসলাম আজো তার আদি ও অকৃত্রিম অবস্থানের ওপরে স্থির রয়েছে।

 

তাহলে ইসলাম কি নির্জিব এবং জীবন-সময় ও কাল বিচ্ছিন্ন কোন জড় বস্ত?

সময়-কাল ও জীবনের নিত্য পরিবর্তনশীল, সদা প্রবাহমানতা ও গতিশীলতার চিরন্তন বৈশিষ্টের সাথে কি ইসলামের কোন সম্পর্ক নাই? সেজন্যই কি সময়-কাল ও জীবনের পরিবর্তনে ইসলামে কোন পরিবর্তন আসেনা?

 

না! বরং ইসলাম এমন এক ব্যাপক ও বিস্তৃত জীবন বিধান যা মানুষের ব্যক্তিগত প্রত্যেকটি আচরনকে নির্দেশিত করে। কি করে মানুষ ঘুমাবে, কি করে জাগ্রত হবে, পরিচ্ছন্নতা অর্জন করবে, হাটবে, বসবে, কথা বলবে, উপার্জন করবে, আহার করবে, মানুষের সাথে সম্পর্কের ধরণ কি হবে তার সবকিছুই ইসলাম নির্দেশ করে। পরিবেশের সাথে সম্পর্ক, সমাজের পারস্পরিক সম্পর্ক, আইন, বিচার, সমাজ ও রাষ্ট্র সকল কিছুই ইসলাম নির্দেশ করে।

 

ইসলাম মানুষকে প্রতিদিন পাঁচ বার নির্দিষ্ট নিয়মে আর্চনা করার নির্দেশ দেয়। মানুষের বোধ-বিশ্বাস, মূল্যবোধ, চিন্তা কাঠামো সকল কিছুই ইসলাম ঠিক করে দেয়। এমন বিস্তৃত, এমন ব্যাপক নির্দেশনা সম্বলিত একটি জীবন বিধান বিশ্ব জুড়ে বিগত সাড়ে ১৪০০ শত বছর ধরে অবিকৃত ও অপরিবর্তনশীল রয়েে গলো এটা মানব সভ্যতার জন্য এক বিষ্ময়কর,অভুতপূর্ণ এবং অনন্য বিষয়।

 

এই অদ্ভুত, বিষ্ময়কর ও অনন্য বিষয়টি কি করে ঘটলো?

কি করে সময়ের, কালের, স্থানের নিত্য পরিবর্তনশীলতাকে উপেক্ষা করে ইসলাম অবিকৃত থেকে গেলো? এটা কি করে সম্ভব হয়েছে সেটা বুঝতে হলো ঐশিগ্রন্থ আল কুরআনের আশ্রয় নিতে হবে। আল কুরআনে এই গ্রন্থের নাজিলকর্তা যিনি নিজেকে মহাবিশ্বের সৃষ্টিকর্তা, পালনকর্তা ও সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন। তিনি সুরা হিজরের নবম আয়াতে জানিয়ে দেন যে, “এই বিধান (ইসলামকে) আমিই অবতীর্ণ করেছি এবং আমিই তার রক্ষাকারী”

এই মহান সত্তা যাকে “আল্লাহ” বলে সম্বোধন করা হয়, যিনি সময়ের সৃষ্টিকর্তা, স্থানের সৃষ্টিকর্তা, এমনকি যিনি বৈচিত্র ও পরিবর্তনেরও সৃষ্টিকর্তা তিনিই যখন ইসলামকে বিকৃতি পরিবর্তন থেকে রক্ষা করার দায়িত্ব নিয়েছেন তখন ইসলাম অবিকৃত থেকে যাবে এটাই স্বাভাবিক। এখানে আশ্চর্যের কিছু নাই।

 

প্রশ্ন হলো, এটা কিভাবে বিকৃতির হাত থেকে রক্ষা হবে?

এই সম্পর্কে সেই মহান সত্ত্বার পক্ষ থেকে একজন, যাকে সেই মহান সত্ত্বা তাঁর বান্দা ও রাসুল হিসেবে ঘোষনা করেছেন এবং যাকে তিনি তাঁর সর্বশেষ বার্তাবাহক বানিয়েছেন, সেই মুহাম্মাদুর রাসুল সা. এক বাণীতে বলেছেন, যার ভাবার্থ হলো, প্রত্যেক যুগেই এমন কিছু মানুষ আসবে যারা এই ইলমকে সর্বপ্রকার বিকৃতি থেকে রক্ষা করবেন।
মহান আল্লাহর বাণী যেমন চিরসত্য তেমনি তাঁর প্রেরিত রাসুল এর বাণীও চিরসত্য। তাই ইসলাম যেমন অবিকৃত রয়েছে তেমনি বিকৃতির অপচেষ্টা প্রতিরোধ কল্পে কিছু নির্বাচিত ব্যক্তিবর্গের আগমন বা উদ্ভবও অবশ্যম্ভাবী।

 

তাই ইসলামের ইতিহাসের প্রতিটি পর্বেই এমন সব ব্যক্তিবর্গের দেখা যায় যারা ইসলামকে বিকৃত করার বা খন্ডিত করার আয়োজন প্রতিরোধ কল্পে দৃঢ়চেতা হয়ে হয়ে দাড়িয়ে গিয়েছেন। যারা আল্লাহ প্রদত্ব ইমানীবল, দৃঢ়তা, বিচক্ষনতা, কৌশল, ইলিম ও তাওয়াক্কুলকে ভিত্তি করে ইসলামকে বিকৃতির হাত থেকে রক্ষা করেছেন। সাইয়্যেদ আবুল হাসান আলী নদভী রহ. তার বিখ্যাত “সংগ্রামী সাধকদের ইতিহাস” এ এমন কিছু মহান ব্যক্তিদের নিয়ে আলোচনা করেছেন।

 

আলোচ্য প্রবন্ধে আমরা বাংলাদেশে তাজদীদে দ্বীনের এক মহান খাদেম, বাঙ্গালি মুসলিম জাতির আলোকবর্তিকা, তাসাউফ-ইলিম ও রাজনীতির ময়দানে ইসলামকে বিকৃতির হাত থেকে রক্ষাকারী, ময়দানের বীর, খানকার পীর সাইয়্যেদ ফজলুল করিম রহ. কর্মক্ষেত্র সম্পর্কে প্রাথমিক আলোচনা করবো ইনশাআল্লাহ।

 

পীর সাহেব চরমোনাই-এর জীবন কালের পরিচিতি
সাইয়্যেদ ফজলুল করীম রহ. এর জীবন কাল ছিলো ১৯৩৫ থেকে ২০০৬ পর্যন্ত। ভারত উপমহাদেশের সবচেয়ে ঘটনাবহুল সময়ের সাক্ষ্য তিনি। তার সময় কালে বাংলাদেশ দুইবার স্বাধীনতা অর্জন করেছে। ব্রিটিশ, পাকিস্তানী ও স্বাধীন বাংলাদেশের বিভিন্ন শাসনামল তিনি দেখেছেন। তাঁর বয়স যখন মাত্র ১০ বছর তখন মুসলিম জাতিয়তাবাদের ভিত্তিতে নিজ ভূমিকে স্বাধীন হতে দেখেছেন। ইসলামের নামে সৃষ্টি হওয়া একটা দেশ নেতৃত্যের খামখেয়ালীপনা ও স্বৈরাচারী মনোভাবের কারনে কি করে ভেঙ্গে যায়, নেতৃত্যের ব্যর্থতার কারনে কি করে মুসলিম জাতীত্ববোধে উজ্জিবিত একটা জাতী মুসলিম জাতীত্ববোধকে পাশে সরিয়ে রেখে ভাষা ভিত্তিক জাতীয়তাবাদকে আঁকড়ে ধরে মুক্তি খোঁজে তার চাক্ষুস সাক্ষ্যি তিনি।

 

তিনি দেখেছেন একটি ভুখন্ডের মুসলিম জনতা যারা বিগত হাজার বছর ধরে মুসলমান এবং নিজ ভূখন্ডের একই ভাষা ও সংস্কৃতির মানুষের হাতে নির্যাতিত হয়েছেন কেবল নিজেদের মুসলিম পরিচয়ের কারনে। এবং কেবল ইসলামকে ধারন করেই মুক্তি খুজেছেন যে জাতী সেই জাতিই রাজনৈতিক ইসলামধারী নেতৃত্যের কপটতায় ইসলামকেই সরিয়ে রেখে ভাষা ভিত্তিক ঐক্যে মুক্তি খুজতে বাধ্য হয়েছেন। তিনি তার মধ্য যৌবন পর্যন্ত দেখেছেন যে, এই ভূখন্ডে ইসলাম কি করে সংকুচিত হতে হতে কেবল ব্যক্তিগত সাপ্তাহিক প্রার্থনার ধর্মে পরিণত হয়েছে।

ইসলামী মাশায়েখদের হাতে আবাদ হওয়া এই ভুখন্ডের মানুষের বোধ-বিশ্বাসে কি করে শিরক-বিদায়াত গেড়ে বসেছে সেটা তিনি মানুষের মাঝ থেকে উপলব্ধি করেছেন। ইসলামের ১৪০০ বছরের স্বীকৃত ব্যাখ্যা বিশ্লেষনের সাথে সাংঘর্ষিক ব্যাখ্যার ওপরে নির্মিত তথাকথিত ইসলামী আন্দোলনও তিনি দেখেছেন।

 

পশ্চিমা বস্তুবাদকে প্রতিহত করতে এবং চেপে বসা ইংরেজ সাম্রাজ্যবাদের মোকাবিলা করতে নেতৃত্ব তৈরীর পুন্যভুমি কওমী মাদরাসাসমূহ এবং উলামায়ে কেরামকে সমাজবিচ্ছিন্ন ও সমাজে প্রভাবহীন অনুল্লেখযোগ্য হতে তিনি দেখেছেন। বাঙ্গালী মুসলিম জাতীর ওপর ধর্ম নিরেপেক্ষতার সয়লাব ও আধিপত্ব তিনি দেখেছেন।

জীবনের প্রথমার্ধের এই সব তিক্ত অভিজ্ঞতা ও বেদনা তাকে একজন প্রত্যয়দীপ্ত আপোষহীন সংস্কারকে পরিণত করেছে।

 

তার কাজের ক্ষেত্রগুলো ছিলো-
ক. দাওয়াত ও তাবলিগ
খ. আত্মশুদ্ধি
গ. বিদায়াত অপসারণ
ঘ. কুরআন শিক্ষার প্রসার
ঙ. ইলমে দ্বীনের প্রসার
চ. ইসলামী রাজনীতি
ছ. ইসলামী ঐক্য প্রতিষ্ঠা
জ. বাংলাদেশে গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরেপেক্ষতার বলয়ের বাহিরে স্বনির্ভর শক্তিশালী ধারা তৈরী।

 

ক. দাওয়াত ও তাবলিগ : ইসলামী দাওয়াতের দুইটা দিক- ১. অমুসলিমদেরকে ইসলামের দিকে আহবান করা। ২. মুসলিমদেরকে তাকওয়া, পরহেজগারির দিকে আহবান করা। বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে মুসলমানদের মাঝে তাকওয়া পরহেজগারির দিকে আহবান করার প্রয়োজনিয়তাই বড় হয়ে দেখা দিয়েছিলো। মানুষের জীবনে ইসলাম চর্চার অবস্থা এতটাই সঙ্গিন যে, নিয়মিত নামাজ আদায় করে এমন মানুষই দিন দিন কমে যাচ্ছিলো। সুদ মহামারির মতো ছড়িয়ে পড়ছিলো। দ্বীনহীনতা ফ্যাশনে পরিণত হচ্ছিলো। গান-বাদ্য শোনা সংস্কৃতির অংশ হয়ে দাড়িয়েছিলো। পর্দা করা পশ্চাৎপদতা বলে বিরোচিত হতো। ধর্মীয় পোশাক ঠাট্টা মশকারার বিষয়ে পরিণত হচ্ছিলো। ইসলামী অনুশাসন মেনে চলা ব্যক্তিকে সমাজিক ভাবে বয়কট করার মতো অবস্থা তৈরী হয়েছিলো। ইসলাম চর্চাকে সন্দেহ করা হতো।

 

এমন এক ভয়াবহ ও দমবন্ধ করা অবস্থায় পীর সাহেব চরমোনাই তাঁর জীবনের শুরু করেন। ১৯৯৭৭ সালে তিনি ভারতে দেওবন্দ আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা শাইখুল ইসলাম রশিদ আহমদ গাঙ্গোহি রহ. এর ধারার “শাইখ” হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। দায়িত্বগ্রহণ করে তিনি বিশাল এক কর্মযুদ্ধ শুরু করেন। “বাংলাদেশ মুজাহিদ কমিটি” নামে পূর্ব প্রতিষ্ঠিত কিন্তু স্বল্প পরিসরের সংগঠনটি তিনি দেশের প্রতিটি ইউনিয়ন (রাষ্ট্রিয় প্রশাসনিক কাঠামোর সর্বশেষ স্তর) পর্যন্ত ছড়িয়ে দিলেন। প্রতিটি ইউনিয়নে তিনি ৩৫ সদস্য বিশিষ্ট কমিটি গঠন করলেন। যাদের কাজ ছিলো সেই ইউনিয়নের প্রতিটি মসজিদে সাপ্তাহিক জিকিরের মজলিস প্রতিষ্ঠা করা।

 

এই জিকিরের মজলিস গুলোর কার্যক্রম অতি চমৎকার। সপ্তাহের নির্দিষ্ট একটি দিন মহল্লার মসজিদে জিকিরের জন্য নির্দিষ্ট থাকে। নির্দিষ্ট দিনে আছরের নামাজের পরে মসজিদের চতুর্দিকের প্রতিটি রাস্তায় বাদ মাগরিব অনুষ্ঠিতব্য ইসলাহী মজলিসের জন্য আহবান করা হয়। বাদ মাগরিব একজন দায়ি মানুষ সৃষ্টির উদ্যেশ্য, কবরের আজাব ও দুনিয়ার ক্ষণস্থায়িত্ব নিয়ে আলোচনা করেন। তারপরে নির্দিষ্ট নিয়মে জিকির হয়। আল্লাহর কাছে তাওবা করা হয় এবং মোনাজাত করা হয়।

 

এই পদ্ধতি খুবই কার্যকর বলে প্রমাণিত হয়। বাংলাদেশে মসজিদের ঘনত্বের কারনে এই দাওয়াত প্রতিটি মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। এবং প্রতি সপ্তাহেই কবরের আজাবের কথা ও মৃত্যুর কথা স্বরণ করে তওবা ইস্তেগফার করার কারনে মানুষের মাঝে বিষ্ময়কর পরিবর্তন সাধিত হয়। মানুষ গুনাহ ত্যাগ করে আল্লাহমুখি হয়, পরকালমুখী হয়।

 

অন্যদিকে তিনি নিজে মাসের তিনদিন ব্যতিত প্রতিদিন দেশের প্রান্তে প্রান্তে সফর করতেন। তিনদিন তিনি বাড়িতে অবস্থান করতেন। সংগঠনের ও নিজ বাড়িতে প্রতিষ্ঠিত মাদরাসার দেখভাল করতেন। এছাড়া বছরে ৩১০-৩২০ দিন তিনি ওয়াজ নছিহতের জন্য দেশের প্রান্তে প্রান্তে সফর করতেন। সকাল ১১-সাড়ে এগারোটার মধ্যে তিনি নির্ধারিত থানা শহরে পৌঁছতেন। সেখানে গিয়ে এলাকার মানুষ জনের সাথে সাক্ষাৎ করতেন,কথা বলতেন এবং খোজ খবর নিতেন। দুপরে স্থানীয় গণ্যমাণ্য ব্যক্তিদের নিয়ে একত্রে খানা খেতেন এবং তাদের সাথে মতবিনিময় করতেন। তাঁর ব্যক্তিত্যের মাঝে প্রবল আকর্ষণ ছিলো এবং প্রভাব বিস্তারী ক্ষমতা ছিলো। তিনি আসছেন শুনলে তাঁর শত্রও তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করতে ছুটে আসতেন। আর তারও এক অদ্ভুত স্বরণ শক্তি ছিলো। একবার কারো সাথে দেখা হলে তিনি তার নাম ও অবস্থা মনে রাখতে পারতেন। পরবর্তী দেখা হলেই নাম ধরে আহবান করতেন, খোজ-খবর নিতেন। এতে তার প্রতি মানুষের শ্রদ্ধা আরো বেড়ে যেতো। তার আরেকটি গুণ ছিলো যে, তিনি সবার সাথে এতো গুরুত্ব দিয়ে কথা বলতেন, শুনতেন ও সমাদর করতেন যে প্রত্যেকের কাছে মনে হতো যে, তাকেই শায়খ সবচেয়ে বেশি সমাদর করছেন।

 

যোহর থেকে মাগরিব পর্যন্ত তিনি রাজনৈতিক অনুষ্ঠানে যোগ দিতেন। সরকারের দুর্নীতি, দুঃশাসনের কড়া সমালোচনা করতেন। ইসলাম বিরোধ কাজের প্রতিবাদ করতেন এবং মানুষকে ইসলামী শাসন প্রতিষ্ঠার আহান জানাতেন। বাদ মাগরিব আয়োজিত ইসলাহী মজলিসে অংশ নিতেন। দেশব্যাপী তার সুনাম সুখ্যাতি ছড়িয়ে ছিলো, প্রতিটি মসজিদে তাঁর প্রতিষ্ঠিত সংগঠনের আয়োজনে প্রতি সপ্তাহেই মাজলিস হতো। ফলে তাঁর উপস্থিতিতে আয়োজিত ইসলাহী মজলিসে প্রচুর লোক সমাগম হতো। সর্বস্তরের মানুষের ঢল নামতো। তিনি ১ থেকে দেড় ঘন্টা নছিহত করতেন। তার নছিহতের বিষয় বস্তু ছিলো, দুনিয়ার ক্ষণস্থয়ীত্ব, কবরের বর্ণনা, মিজান-পুলসিরাত ও কেয়ামতের বর্ণনা, জান্নাত-জাহান্নামের আলোচনা এবং আল্লাহর বড়ত্ব নিয়ে আলোচনা। প্রচুর আয়াত-হাদিস তিনি নছিহতে ব্যবহার করতেন। তাঁর বয়ান প্রচন্ডরকম হৃদয়গ্রাহী ছিলো। তাঁর বয়ানের সময মানুষ চোখের পানি ধরে রাখতে পারতো না। তিনি নিজেও পরকালের স্বরণে ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে অশ্রঝড়া নয়নে কুরআন হাদিসের আলোকে যেভাবে পরকালের আলোচনা করতেন তাতে শ্রোতাগণ যেন চোখের সামনে পরকাল দেখতে পাচ্ছে এমন অবস্থা তৈরী হতো, কান্নার রোল পড়ে যেতো। অনেকেই জ্ঞান শুন্য হয়ে যেতো। তাঁর প্রতিটি মাহফিলের পরেই এলাকার মাসজিদে নামাজির সংখ্যা বৃদ্ধি পেতো। নতুন নতুন মানুষ ইসলামী অনুশাসন মেনে চলা শুর করতো। অনেক বড়-বড় দাগি অপরাধীরাও তাঁর বয়ানে হেদায়েত হয়ে যেতো।
দাওয়াতের ময়দানে তার এই নিরবচ্ছিন্ন পরিশ্রমের ফলে বাংলাদেমে মানুষের মাঝে ইসলামী অনুশাসন মেনে চলার প্রবনতা বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে।

 

আত্মশুদ্ধি : নবী ও রাসুল প্রেরণ করার অন্যতম উদ্দেশ্য ছিলো আত্মশুদ্ধি করা। নিয়ত শুদ্ধ না হলে কোন ইবাদতই গ্রহণ যোগ্য হয় না। রাসুল সা. বিখ্যাত হাদিসে জিবরাইলে ইবাদতের এমন এক স্তরের কথা বলেছেন, যেখানে বান্দার মাঝে এমন অবস্থা তৈরী হবে যে, বান্দা যেনো ইবাদত করার সময় আল্লাহকে দেখছেন, সেটা সম্ভব না হলে অন্তত এতটুকু হতে হবে যেনো বান্দা মনে করে আল্লাহ আমাকে দেখছেন। রাসুল সা. একে ইহসান বলে অবহিত করেছেন।

ইহসানের এই স্তর অর্জন করা, নিয়তশুদ্ধ করা ইত্যাদি আত্মশুদ্ধির সাথে সম্পর্কিত। মুমিন মাত্রই আত্মশুদ্ধি সয়ংক্রিয় অর্জিত হয় না। বরং আত্মশুদ্ধি অর্জন করতে আলাদা করে সাধনা করতে হয়। আত্মশুদ্ধির পন্থা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও আত্মশুদ্ধির প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন করার অবকাশ নেই।

 

পীর সাহেব চরমোনাই রহ. লক্ষ্য করলেন যে, বাংলাদেশে ইসলাম একটা প্রথা হয়ে দাড়িয়েছে। বংশগত ভাবে মুসলমান ইসলামের উত্তাপ অনুভব করে না। নামায- রোজা সামাজিক প্রথা হিসেবে পালন করছে কিন্তু নামায ব্যক্তিকে পাপাচার থেকে রক্ষা করতে পারছে না। রোজা থাকছে কিন্ত তাকওয়া অর্জিত হচ্ছে না, যাকাত দেয়া প্রদর্শনীর বিষয় হয়ে দাড়িয়েছে। হজে যাওয়া সম্পদ প্রদর্শনের উপকরণ হয়ে দাড়িয়েছে। এমত অবস্থায় পীর সাহেব চরমোনাই সমাজের মানুসের মাঝে “ইহসান“ সৃষ্টি করার জন্য ব্যাপক ভিত্তিক কর্মসূচি প্রচলন করলেন। কর্মসূচির ক্ষেত্রে তিনি দেওবন্দি ধারার অনুসারী ছিলেন। তিনি তার সংগঠনের মাধ্যমে দেশব্যাপী আত্মশুদ্ধির অর্জনের কার্যক্রম প্রশারিত করলেন। কর্মসূচিগুলো হলো, ১. সকাল-সন্ধা জিকরুল্লাহ, ২. সপ্তাহে একদিন আনুষ্ঠানিক দাওয়াত, পরকালের সংক্ষিপ্ত আলোচনা ও জিকরুল্লাহ, ৩. মাসে একদিন আরো বড় পরিসরে দাওয়াত এবং রাতব্যাপী মৃত্যু-কবর ও পরকালের আলোচনা জিকরুল্লাহ, তালিম-তারবিয়াত ও আত্মপর্যালোচনা, ৪. ইসলামী সাহিত্য অধ্যায়ন, বিশেষত সিরাত, আসারে সাহাবা, তাবেয়িন ও মাশায়েখ, ৫. বছরে ২ বার কেন্দ্রীয়ভাবে আয়োজিত মাহফিলে অংশ নেয়া।

 

আত্মশুদ্ধি অর্জনের এই সংগ্রাম বাংলাদেশে এক অদ্ভুত ও বিষ্ময়কর অবস্থা তৈরী করেছে। উলামায়ে কেরাম, সরকারী কর্মকর্তা-কর্মচারী আইন শৃংখলা বাহিনী, সাধারণ শ্রমজীবি মানুষ সকল স্তরের বড় একটি অংশের মাঝেই দৃষ্টিগ্রাহ্য পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। একবারে প্রত্যন্ত অঞ্চলে, এমনকি বিচারালয়েও এমন মানুষের দেখা পাওয়া যাবে যাদের নামাজের একগ্রতা, সুন্নতের পাবন্দি ও শরিয়তের অনুসরনে নিষ্ঠা প্রাচীন যুগের কথা মনে করিয়ে দেয়।

 

বিদায়াত অপসারণ
বাংলাদেশের একটি ঐতিহাসিক বাস্তবতা আছে। এই ভুখন্ডে ইসলাম এসেছে “তাসাউফপন্থী” দের হাত ধরে। এখানকার মুসলমানদের বড় একটি অংশ হিন্দু থেকে মুসলমান হয়েছে। মাশায়েখে কেরামের কাজের পরিধি অনেক বেশি থাকার কারনে দাওয়াত দিয়ে মুসলমান বানানোর পরে দীর্ঘ তালিম-তারবিয়াতের মাধ্যমে নবদিক্ষিত মুসলিমদের আচার প্রথা ও সংস্কৃতিকে পুর্নাঙ্গ ইসলামের রঙ্গে রাঙ্গাতে পারেন নাই। দ্বীনি ইলিমের গভীর চর্চার ব্যাপকতা তৈরী করতে পারেন নাই। ফলে বাংলাদেশের মানুষ ইসলাম গ্রহণ করলেও এবং ইসলামের তাওহিদের মর্ম তারা মনে প্রাণে মান্য করলেও পুরাতন সংস্কৃতি ও দ্বীনি ইলিমের স্বল্পতার কারনে বিদয়াত এখানে সহজে প্রবেশ করতে পেরেছে। দুঃখের ব্যাপার হলো শিরকের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে এলাকার পর এলাকায় তাওহিদের আবাদ করা শায়খগন মারা যাওয়ার পরে তাদের কবরকে কেন্দ্র করেই অন্য ধরনের শিরকের চর্চা হয়েছে। আবার কিছু দুরাচার তাসাউফ চর্চার নামে বিদয়াতের প্রসার ঘটিয়েছে।

 

পীর সাহেব চরমোনাই সারা জীবন এই সবের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছেন। তাসাউফ চর্চার নামে বিদয়াতের অপসারনে তিনি বহুমাত্রিক পদ্ধতি প্রয়োগ করেছেন। ১. বিদয়াত পন্থীদের সাথে সাক্ষাত করে ব্যক্তিগত সম্পর্ক উন্নয়ন করে তাদেরকে বিদয়াত থেকে সরিয়ে সুন্নত অনুসারে আহবান করা। ২. ওয়াজ নছিহতের মাধ্যমে বিদয়াতপন্থী অনুসারীদেরকে বিদয়াতের ভয়াবহতা বুঝিয়েছেন এবং সাধারণ মানুষকে বিদয়াত থেকে সরিয়ে এনেছেন। ৩. বিদয়াতপন্থীদের সাথে বাহাস করে কুরআন-হাদিসের আলোকে তাদের কৃত বিদয়াতসমূহকে চিহ্নিত করে দিয়েছেন এবং ফিরে আসার আহবান করতেন। ৪. বিদয়াতী আস্তানা ভেঙ্গে দেয়া। তার নেতৃত্ব্যে দেওয়ানবাগী নামে এক নিকৃষ্ঠ বেদয়াতীতে নারায়ণগঞ্জ জেলা থেকে উৎখাত করা হয়েছে। ৫. বিদয়াত প্রবন এলাকায় মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করা। স্থানীয় শিশুরা মাদরাসায় পড়ার মাধ্যমে স্থানীয়ভাবেই বিদয়াতের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে উঠেছে।
স্বভাবত শান্ত মেজাজের এবং সর্বত্র ইসলামী শক্তির মাঝে ঐক্যপ্রত্যাশি এই শায়খ বেদয়াতের ব্যাপারে কঠোর ছিলেন। বিদয়াতিদের বিরুদ্ধে সর্বদা আপোষহীন অবস্থান গ্রহণ করতেন।

 

কুরআন শিক্ষার প্রসার
বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিলো “মক্তব”। অতিত থেকেই এই ব্যবস্থা প্রবতর্তিত ছিলো যে, ফজরের নামাজের পর এলাকার ৭-৮ বছরের সব শিশু মসজিদে চলে আসতো। ১ দেড় ঘন্টা মসজিদে তারা আরবী পড়া শিখতো, ইসলামী দর্শনের প্রাথমিক পাঠ গ্রহণ করতো। এই ব্যবস্থার কারনে বাংলাদেশের মানুষ প্রায় সবাই চাই সে অন্য শিক্ষায় মুর্খ থাকুক বা অন্য যে কোন শিক্ষা গ্রহণ করুণ-কুরআন পড়তে পারতো। বাংলাদেশের প্রায় সবাই প্রয়োজনিয় মাসয়ালা জানতো। এমনকি দৈনন্দিন জীবনে ইসলামের অনুশাসন উপেক্ষা করা ব্যক্তিও কুরআন পড়তে পারতো এবং নাস্তিকতা থেকে মুক্ত থাকতো। কিন্তু স্বাধীনতার পরে এদেশে বিদেশি মদদপুষ্ট এনজিওরা এই মক্তবের বিরুদ্ধে উঠেপড়ে লাগে। এইসব মক্তবের বিচ্ছিন্ন ঘটনাকে কেন্দ্র করে নানা অপপ্রচার করে এবং নানামুখি ষড়যন্ত্র করে এই মক্তবগুলোকে বন্ধ করার চেষ্টা করে এবং অনেক ক্ষেত্রে সফলও হয়।

পীর সাহেব চরমেনাই এর বিরুদ্ধে এর সর্বব্যাপি সংগ্রাম গড়ে তুললেন। তিনি ঘোষনা করলেন “৬৮ হাজার গ্রামে ৬৮ হাজার মক্তব প্রতিষ্ঠা করতে হবে।” (বাংলাদেশে তৎকালে ৬৮ হাজার গ্রাম ছিলো)
এই শ্লোগান দিয়ে তিনি বাংলাদেশের প্রতিটি গ্রামে একটি করে মক্তব প্রতিষ্ঠার কার্যক্রম শুরু করেন। এজন্য তিনি প্রতিষ্ঠা করেন বাংলাদেশ কুরআন শিক্ষ বোর্ড।
এর মাধ্যমে তিনি নিরলসভাবে কাজ করে গিয়েছেন। আল্লাহর রহমতে বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি গ্রামেই মক্তব রয়েছে। তার এই প্রচেষ্টার মাধ্যমে বাংলাদেশের নতুন প্রজন্মকে নাস্তিক বানানোর খ্রিষ্ট্রিয় অপচেষ্টা নাস্যাৎ হয়ে গেছে।

কুরআন শিক্ষা বোর্ডের আরেকটি কাজ হচ্ছে, খ্রিষ্ট্রিয় অপচেষ্টার ফলে যে প্রজন্ম গড়ে উঠেছে বা পরবর্তীতে যারা কুরআন পড়া ভুলে গিয়েছে তাদেও জন্য বয়স্ক কুরআন শিক্ষা কার্যক্রম চালু রয়েছে। দেশের প্রতিটি শহরেই বয়স্ক বিনামুল্যে কুরআন শিক্ষা কার্যক্রম চালু রয়েছে।

 

ইলমি দ্বীনের প্রসার
নাস্তিক্যবাদ, বস্তুবাদ ও বিদয়াত রুখতে এবং ইসলামী দাওয়াত ও ইসলামী হুকুমত প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে বহু সংখ্যক ধর্মীয় নেতৃত্বের দরকার হয়। আর নিষ্ঠাবান ধর্মীয় নেতৃত্ব তৈরীর ক্ষেত্রে মাদরাসার বিকল্প কিছু হতে পারে না। পীর সাহেব চরমোনাই এই সত্যকে অনুধাবন করে নিষ্ঠাবান ও প্রশিক্ষিত ধর্মীয় নেতৃত্ব তৈরীর জন্য বহুসংখ্যক মাদরাসা তৈরী করেছেন। “জামেয়া কারিমিয়া” নামে দেশের প্রায় প্রতিটি জেলা শহরেই মাদরাসা গড়ে উঠেছে। মাদরাসাগুলো শিক্ষা সিলেবাসে দেওবন্দকে অনুসরণ করে। বাংলাদেশে অন্য কওমি মাদরাসাসমূহ থেকে এই মাদরাসাগুলোর মৌলিক পার্থক্য হলো, এখানে কেবলই পুথিঁগত জ্ঞান পুঞ্জিভুত করা হয় না। বরং দেওবন্দ প্রতিষ্ঠার মূল লক্ষ্যের সাথে সংগতি রেখে শিক্ষার পাশাপাশি দাওয়াত ও তাবলিগ, ইসলাহে নফস, ইসলাম হুকুমত প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে শিক্ষার্থীরা অংশ গ্রহণ করে। আগামী সমাজকে রাজনৈতিক আধ্যাত্মিক নেতৃত্ব দিতে একেবারেই শুরু থেকে প্রশিক্ষিত করে তোলা হয়।

 

ইসলামী ঐক্য প্রচেষ্টা
পীর সাহেব চরমোনাই রহ. সর্বদাই ইসলামী শক্তির ঐক্যের ব্যাপারে ব্যাকুল ছিলেন। স্বাধীন বাংলাদেশে ইসলামী ঐক্যের ব্যাপারে পীর সাহেব চরমেনাই রহ. ভুমিকা সম্পর্কে এখানে আমি অধ্যাপক গোলাম আজম যিনি জামায়াতে ইসলামীর বহুদিনের আমীর এবং বাংলাদেশী জামায়াতে ইসলামীর প্রধান তাত্ত্বিক তার লিখিত “বাংলাদেশে ইসলামী ঐক্য প্রচেষ্টার ইতিহাস” বই থেকে সামান্য উদৃতি দিচ্ছি। এখানে অধ্যাপক গোলাম আজম সাহেবকে বেছে নেয়ার কারণ হলো মতাদর্শগত কারণে পীর সাহবে চরমোনাই জামায়াতে ইসলামের তীব্র সমালোচনা করতেন। এবং বাংলাদেশের রাজনীতির ময়দানে পীর সাহবে চরমোনাই এর প্রধান দ্বৈরথও ছিলো তার সাথে। তো তার বর্ননা নিশ্চয় ভক্তি-শ্রদ্ধা মিশ্রিত কাহিনী হবে না। বরং চরম সত্যের নিয়ন্ত্রিত প্রকাশ হবে। সেই নিয়ন্ত্রিত সত্যই পীর সাহেব চরমেনাই রহ. ঐক্য প্রচেষ্টার একটি ব্যাকুল চিত্র তুলে ধরবে। অধ্যাপক গোলাম আজম সাহেবের বক্তব্যের সারাংশ হলো “১৯৭৯ সালে ইসলামী ঐক্য প্রচেষ্টা শুরু করতেই পীর সাহেব চরমেনাই অত্যন্ত সক্রিয় ভুমিকা পালন করেন। এই ধারাবাহিকতায় ১৯৮১ সালে “ইত্তেহাদুল উম্মাহ” গঠিত হলে তখন সবাই পীর সাহেব চরমোনাইকে মুখপাত্র নির্বাচিত করা হয়। পরের বছরের সম্মেলনেও তাকেই মুখপাত্র নির্বাচিত করা হয়। ১৯৭৯-৮৯ পর্যন্ত পীর সাহেব চরমেনাই গোলাম আজমের সাথে ঐক্য প্রচেষ্টা নিয়ে ঘনিষ্ট সম্পর্ক রক্ষা করেছেন।” ১৯৮৭ সালে দেশের ইসলামপন্থীদের প্রথম রাজনৈতিক সংগঠন ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলন গঠিত হলে পীর সাহেব চরমেনাই তারও মুখপাত্র নির্বাচিত হন। ইশা আন্দোলন প্রতিষ্ঠার সময় জামায়াতে ইসলামী বিশ্বাসঘাতকতার কারনে পীর সাহেব চরমোনাই জামায়াতের প্রতি অসন্তুষ্ট থাকলেও ১৯৯০ এর ১লা মে আবারো ঐক্যের জন্য গোলাম আজমের সাথে বৈঠক করেছেন।

 

এর বাইরে ১৯৯০ সালের ২২ ডিসেম্বর বাংলাদেশে “ইসলামী ঐক্যজোট” নামে একটি জোট গঠন হয়, সেই জোট গঠনে অগ্রণী ভুমিকা পালন করেন পীর সাহেব চরমেনাই। তবে ২০০১ সালে ইসলামী ঐক্যজোট তার মূল গঠনতন্ত্রের খেলাফ করে চারদলীয় জোটে যোগদান করলে পীর সাহেব চরমোনাই সেখান থেকে বেরিয়ে আসেন।

 

গণতন্ত্র সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতাবাদরে বাহিরে ইসলামী ধারা তৈরী
১৯৭৯ সাল থেকে পীর সাহেব চরমোনাই ইসলামী শক্তির ঐক্য প্রক্রিয়ার একজন ব্যাকুল সৈনিক ছিলেন। তিনি সর্বদাই চাইতেন যে, বাংলাদেশে মানবচরিত সকল মতবাদের বাহিরে ইসলামকে কেন্দ্র করে একক স্ব-নির্ভর শক্তিশালী কোন ধারা তৈরী হোক। সেজন্য তিনি নানা রকম প্রচেষ্টা চালিয়েছেন। কিন্তু তিনি বারংবার হতাশ হয়েছেন। ১৯৮৭ সালে ইত্তেহাদুল উম্মাহের সাদারাতে জামায়াতে ইসলামীর প্রতিনিধির উপস্থিতিতে ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলন প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত সত্ত্বেও শেষ মুহার্তে জামায়াতের বিরোধিতা ও বিশ্বাসঘাতকতা তাকে হতাশ করেছে। সর্বশেষ ২০০১ সালের নির্বাচনের প্রাক্কালে তৎকালিন ইসলামী ঐক্যজোট নীতিমালা বিরুদ্ধভাবে ইসলামের স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে গণতন্ত্রবাদী সেক্যুলার জোটে অংশগ্রহণ করলে তিনি চুড়ান্তভাবে ব্যাথিত হন এবং এককভাবে সংগঠন মজবুত করার দিকে মনোযোগ দেন। তারই প্রেক্ষিতে ২০০১ সাল থেকে তার সংগঠন দেশ ব্যাপী সংগঠন গড়ে তোলা ও এককভাবে নির্বাচন করার সিদ্ধান্ত নেন। যার ফলে ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনের সময় বাংলাদেমের একক ও সর্ববৃহৎ ইসলামী শক্তি হিসেবে শক্তি জানান দিয়েছে তার প্রতিষ্ঠিত ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। সদ্য সমাপ্ত জাতীয় নির্বাচনে নৌকা প্রতিকে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীরা, ধান প্রতিকে সেক্যুলার জাতীয়তাবাদীরা আর হাতপাখা প্রতিক নিয়ে ইসলামপন্থীরা নির্বাচন করেছে। প্রচার-প্রচারনায় ইসলামী আন্দোলনের নেতৃত্বাধীন ইসলামপন্থীরা সত্যিকার অর্থে ধর্মনিরোপেক্ষতাবাদী ও জাতীয়তাবাদীদেরকে চ্যালেঞ্জ করেছে।
দেশে ইসলামী শাসনতন্ত্র প্রতিষ্ঠার যে স্বপ্ন পীর সাহেব চরমোনাই রহ. দেখতেন তা হয়তো এখনো বাস্তবায়ন হয়নি কিন্তু বাংলাদেশের রাজনীতিতে নৌকা-ধানের বিপরিতে ইসলামপন্থীরা বিকল্প শক্তি হিসেবে দাড়িয়ে গিয়েছে।

 

ইসলামী রাজনীতি
পীর সাহবে চরমেনাই এর রাজনৈতিক পথচলা সম্পর্কে মোটামোটি আলোচনা হয়েছে। এখানে তার রাজনীতির মূল দর্শনগুলো তুলে ধরছি।
-ইবাদাত হিসেবে রাজনীতি করা।
-ইসলামী মূলনীতিতে অটল অবিচল থাকা কিন্তু কৌশল গ্রহণে সমকালকে ধারণ করা।
-ইসলামের আত্মমর্যাদা ও স্বার্থ রক্ষা করে জোটবদ্ধতার নীতি।
-ইসলামের মর্যাদা ও স্বার্থ রক্ষা না হলে একলা চলো নীতি।
-বাহ্যিক কোন সফলতা বা ঝুকির পরোয়া না করে ইসলামের মৌলিক নীতিতে অটল অবিচল।
-খেলাফত আলা মিনহাজিলন্নবুওয়াহ প্রতিষ্ঠায় তাত্তি¡ক ও প্রয়োগিক দিক থেকে সঠিক ও কার্যকর সংগঠন তৈরী করা।
-রুহানিয়াত ও জিহাদের সমন্বয়।

 

শেষকথা

তাজদিদে দ্বীন বা দ্বীন সংস্কার আন্দোলন ইসলামের বিশেষ অলৌকিকত্ব। দ্বীনের একেবারে শুরু থেকেই প্রতিটি যুগে, প্রতিটি সমস্যার প্রেক্ষিতে সংস্কার আন্দোলন হয়েছে। বাংলাদেশেও বিভিন্ন মণিষি বিভিন্ন সময়ে সংস্কারমূলক কার্যক্রম করেছে। পীর সাহেব চরমোনাই রহ. ছিলেন সেই ধারার সফলতম একজন। যার সংস্কার কাজে বহুমাত্রিকতা ছিলো। তিনি আদর্শের ও মূলনীতিতে ছিলেন ইসলামের মূলধারার নিষ্ঠাবান অনুসারী, কর্মকৌশলে সমকালীন, ব্যক্তিগত আচরণে সুফি ঘরনার। দুনিয়া বিমুখতা তার সৌন্দর্য ছিলো। দাওয়াতে ব্যকুলতা তার স্বভাব ছিলো মানুষকে আকৃষ্ঠ করার এক স্বহজাত ক্ষমতা ছিলো তার ফলে তাঁকে কেন্দ্র করে দেশে একগুচ্ছ সংগঠন গড়ে উঠেছে। সেই সকল সংগঠনে স্বপ্রনোদিত সংগঠকের সমাবেশ ঘটেছে। ফলে তাঁর সংস্কার কাজ এগিয়ে যাচ্ছে।
আল্লাহ তায়ালা শায়েখ ফজলুল করীম রহ. সংস্কারমূলক কাজ এগিয়ে নেয়ার তাওফিক দান করুন। আমিন।

 

 

লেখক-

শেখ ফজলুল করীম মারুফ

সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি

ইসলামী শাসনতন্ত্র ছাত্র আন্দোলন

শেয়ার করুন

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on facebook

অন্যান্য স্মরণীয় নেতৃত্ব

Scroll to Top

সদস্য ফরম

নিচের ফরমটি পূরণ করে প্রাথমিক সদস্য হোন

small_c_popup.png

প্রশ্ন করার জন্য নিচের ফরমটি পূরণ করে পাঠিয়ে দিন