প্রিয় সাংবাদিক বন্ধুগণ, ভারাক্রান্ত হৃদয়ে আজকের এই সংবাদ সম্মেলন আয়োজন করতে হয়েছে। যে দেশের প্রায় সকল মানুষ ধর্মপ্রাণ এবং অধিকাংশ মানুষ মুসলমান সেই দেশের সরকার ধর্ম ও ইসলামবিরুদ্ধ কোন আইন জাতীয় সংসদে পাশ করতে পারে এটা কল্পনা করাও কষ্টকর। বিশেষত এমন একটা সরকার যারা ফ্যাসিবাদ বিরোধী দীর্ঘ সংগ্রাম ও জুলাই গণঅভ্যুত্থানের রক্তাক্ত পথ মাড়িয়ে ক্ষমতায় এসেছে। আমাদের আহবানে আপনারা এসেছেন সেজন্য আপনাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।
প্রিয় সাংবাদিক বন্ধুগণ!
ঘটনা প্রবাহ আপনারা জানেন। গত ৬ সেপ্টেম্বর, রোববার সংসদে ১৮৮২ সালের সম্পত্তি হস্তান্তর আইনের একটি সংশোধনী আনা হয়। সম্পত্তি হস্তান্তর (সংশোধন) আইন-২০২৬ নামে আইনটি কন্ঠভোটে পাশ করা হয়। এই আইনে কুরআনে বর্ণিত ইসলামের অকাট্য একটি বিধানে পরিবর্তন আনা হয়েছে।
এই ক্ষেত্রে আমাদের বক্তব্য খুবই স্পষ্ট। দেশের অধিকাংশ মানুষ মুসলমান, তাদের ধর্মীয় বিধান পালনে সহায়তা করতে রাষ্ট্র বাধ্য। সংবিধানের ধারা-৪১ এ প্রত্যেক নাগরিককে ধর্ম পালনের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার কথা বলা আছে। ফলে সরকার কখনোই এমন কোন আইন করতে পারে না যা নাগরিকের ধর্ম পালনে বাঁধা সৃষ্টি করে।
এছাড়া বর্তমান সরকারও কুরআন-সুন্নাহ বিরোধী কোন আইন করবে না বলে বারংবার অঙ্গিকার করেছে। কিন্তু সরকারের ছয়মাস যেতে না যেতেই সরকার শরীয়াহ বিরোধী আইন পাশ করেছে। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এর তীব্র নিন্দা করছে এবং প্রতিবাদ জানাচ্ছে। একই সাথে দাবি জানাচ্ছে যে, অবিলম্বে এই আইন বাতিল করতে হবে।
প্রিয় সাংবাদিক বন্ধুগণ!
সংসদে পাশ হওয়া সম্পত্তি হস্তান্তর আইন-১৮৮২ এর সংশোধনকল্পে আনীত “সম্পত্তি হস্তান্তর (সংশোধন) আইন-২০২৬” আইনের উদ্দেশ্য ও কারণ শিরোনামে আইনমন্ত্রীর দেয়া বিবৃতিতে বলা হয়েছে, সম্পত্তি হস্তান্তরের বিভিন্ন পদ্ধতির পাশাপাশি আরেকটি পদ্ধতি যোগ করতে এই আইন করা হয়েছে।
প্রথমতঃ এখানে পরিস্কার করে বলে রাখা দরকার যে, সম্পত্তি হস্তান্তরের পদ্ধতি ইসলামী শরীয়াহতে বিস্তারিত বলা হয়েছে। পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ তায়ালা উত্তরাধিকার আইনকে যত বিস্তৃতভাবে বর্ননা করেছেন তা অন্য আর কোন বিধানের ক্ষেত্রে করেন নাই। সম্ভাব্য সকল প্রকার ও পদ্ধতি বর্ণনা করা হয়েছে। সেখানে পরিবারের প্রথম স্তর (সন্তান ও তৎসম্পর্কিত), ২য় স্তর (বাবা-মা, ভাই-বোন ও তৎসম্পর্কিত), ৩য় স্তর (দাদা-চাচা ও তৎসম্পর্কিত) সহ সকলকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
উত্তরাধিকার বন্টনের ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক বন্ধন ও দায়িত্ববোধ বিবেচনা করা হয়েছে। ফলে এখানে নতুন করে কোন পদ্ধতি সংযোজন করার দরকার নাই, সুযোগও নাই।
দ্বিতীয়তঃ এমন আইন করার প্রয়োজন হলো কেন? এই আইনের কারণ ব্যাখ্যায় মন্ত্রীদের বক্তব্যে যে বার্তা পাওয়া যাচ্ছে তাহলো, শরীয়াহ নির্দেশিত উত্তরাধিকার আইনকে এড়িয়ে সন্তানদের জন্য সম্পত্তি এককভাবে নির্দিষ্ট করা নিমিত্তে “হেবা”র অপব্যবহারে সৃষ্ট একটি সমস্যার সমাধান সরকার করতে চাইছে। ইসলামের উত্তরাধিকার আইনে কোন কোন পরিস্থিতিতে সম্পত্তি সন্তানদের বাইরেও ভাই, চাচা,দাদা ও অন্যান্যদের অধিকারে পরিনত হয়। তেমন পরিস্থিতিতে সন্তানদের বাইরের অন্যদের বঞ্চিত করতে সন্তানদের নামে সম্পত্তি “হেবা” করার একটি প্রবনতা আমাদের সমাজে বিদ্যমান।
শরীয়াহর উত্তরাধিকার আইনকে বাইপাস করার এই প্রবনতার একটি গ্রাহ্য নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া হলো, যেই সন্তানের জন্য শরীয়াহকে বাইপাস করা হচ্ছে সেই সন্তানই “হেবা”সূত্রে সম্পদের মালিক হয়ে বাবা-মাকে সম্পদের ভোগ থেকে উচ্ছেদ করছে।
এই উচ্ছেদ করা অনেক ¶েত্রেই মানবিক প্রশ্ন তৈরি করে। বৃদ্ধ বয়সে বাবা-মাকে গৃহহীন হতে হচ্ছে, মানবেতর জীবন যাপন করতে হচ্ছে। এই মানবিক প্রশ্নের সমাধান করা জরুরী।
কিন্তু এখানে মনে রাখতে হবে, এই সমস্যা শরীয়াহকে এড়িয়ে যাওয়ার কারণে সৃষ্ট। তাই এই সমস্যা সমাধান করার জন্য আবারো শরীয়াহকে অমান্য করে “হেবা”র বিধানে পরিবর্তন করা যাবে না। সেই অধিকার ইসলাম কাউকে দেয় নাই। বরং সর্বত্র শরীয়াহ মান্য করার মানসিকতা রাখতে হবে।
প্রিয় সাংবাদিকবৃন্দ!
এখানে একটা বিষয় পরিস্কার করা জরুরী। সরকার বলছে, হেবা সংক্রান্ত আইন বহাল থাকবে। এই সংশোধনীর মাধ্যমে দান বা গিফটের আরেকটি পদ্ধতি তৈরি করা হয়েছে। এখানে দুইটা বিষয়। এক-একটি মুসলিম দেশে শত বছর ধরে প্রচলিত একটি শরীয়াহ সমর্থিত আইনকে বাইপাস করার সুযোগ রাষ্ট্র কেন তৈরি করবে? মুসলিম হিসেবে শরীয়াহ আইন মানার সুযোগ তৈরির বদলে শরীয়াহ আইনকে এড়িয়ে যাওয়ার কোন সুযোগ আমরা তৈরি করতে দিতে পারি না।
দুই, জীবনসত্ব রেখে যে হেবা করার সুযোগ রাখা হচ্ছে তা আদতে হেবা হচ্ছে না। সেটা অসিয়ত হচ্ছে। কিন্তু ওয়ারিসদের জন্য কোন অসিয়ত নাই। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ প্রত্যেক হকদারকে তাঁর প্রাপ্য অধিকার দিয়ে দিয়েছেন, সুতরাং কোনো ওয়ারিশের জন্য অসিয়ত নেই (সুনানে তিরমিযি: ২১২০)।
আরেক হাদিসে এসেছে, যে ব্যক্তি আল্লাহ নির্ধারিত উত্তরাধিকার বাতিল করার চেষ্টা করে, আল্লাহ তার জন্য জান্নাতের উত্তরাধিকার বাতিল করে দেন। (সুনানে সাঈদ বিন মানসূর, পৃ. ১১৮, হাদীস ২৮৫; মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বা, খ. ১৬, পৃ. ২১৫, বর্ণনা ৩১৬৬৮)
মানে হচ্ছে এই আইনের মাধ্যমে মানুষকে এমন একটা সুযোগ তৈরি করে দেয়া হচ্ছে, যার ব্যবহারে মানুষের জান্নাতের উত্তরাধিকার বাতিল হয়ে যাবে।
প্রিয় সাংবাদিক বন্ধুগণ!
বাংলাদেশে বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। যুগ সেরা উলামায়ে কেরাম রয়েছেন। এই আইনের বিষয়ে উলামায়ে কেরাম আগেই ভিন্নমত পোষন করেছেন।
সেখানে শরীয়াহ সংক্রান্ত একটি বিষয়ে খ্রিষ্টান পন্ডিতদের রেফারেন্স ব্যবহার করে শরীয়াহ বিরুদ্ধ আইন প্রণয়ন করা দেশের ইতিহাস,ঐতিহ্য ও জ্ঞানীয় সম্পদের প্রতি স্পষ্ট উপেক্ষা। এর মাধ্যমে সরকার দেশের উলামাদের অপমান করেছে।
প্রিয় সাংবাদিক বন্ধুগণ!
হেবার পরে সম্পত্তি থেকে বাবা-মাকে উচ্ছেদের ঘটনা রোধ করতেই হবে। সেজন্য আমাদের সমাজে, সংস্কৃতিতে ও শিক্ষায় বাবা-মায়ের প্রতি সন্মানের ধারণাকে গ্রোথিত করতে হবে। ইসলামের চর্চা নিশ্চিত করতে হবে। শিশুবয়সেই ধর্মীয় চেতনা জাগরুক করতে হবে। আমাদের ঐহিত্য অনুসারে একান্নবর্তী পরিবারের ধারণা আবারো ফিরিয়ে আনতে হবে।
একই সাথে বাবা-মায়ের প্রতি কর্তব্য অবহেলাকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ বিবেচনা করে আইনের প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। অনেক ক্ষেত্রেই বাবা-মা সন্তানদের বিরুদ্ধে মামলা করতে চান না। সেক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারে। সমস্যা সমাধানের অনেক উপায় আছে। কিন্তু এই সমস্যার সমাধান করতে গিয়ে শরীয়াহকে আরেকবার অমান্য করা যায় না।
প্রিয় সাংবাদিক বন্ধুগণ!
আইনমন্ত্রীকে কথাবার্তায় আরো মার্জিত হতে হবে। এই আইন নিয়ে তিনি যেভাবে ব্যাখ্যা দিচ্ছেন তা শোভনীয় না। তিনি ব্রিটিশ ও পশ্চিমা আইনে বিজ্ঞ হতে পারেন কিন্তু শরীয়াহ্ আইন ও তার তৎপরতা নিয়ে তার চেয়ে উলামায়ে কেরামের প্রাজ্ঞতা বেশি। ফলে শরীয়াহ সংক্রান্ত বিষয়ে উলামায়ে কেরামের মতামতকে গুরুত্ব দেয়া উচিৎ।
প্রিয় সাংবাদিক বন্ধুগণ!
সরকারকে বলবো, দেশে বহুবিদ সমস্যা রয়েছে। নিত্যদিনের সমস্যায় মানুষ জর্জরিত। বেকারত্ব বাড়ছে। দ্রব্যমূল্য লাগাম হারিয়েছে। সন্ত্রাসে তটস্থ হচ্ছে মানুষ। বিদ্যুতের সংকটে নাজেহাল জনতা। এমন বাস্তবভিত্তিক সমস্যার সমাধান না করে সরকার শরীয়াহ বিরুদ্ধতায় নেমে যাওয়া জাতির জন্য হতাশাজনক।
আমরা সরকারের সদিচ্ছার প্রতি সুধারণা রাখছি। সম্ভবত গভীরভাবে না ভেবেই আইনটি আনা হয়েছে। সেজন্য সরকারকে বলবো, আইনটি নিয়ে অধিকতর পর্যালোচনা করুন। উলামায়ে কেরাম ও আইনবিদদের সাথে পরামর্শ করুন। প্রয়োজনীয় সংশোধনী আনুন। কিন্তু সমস্যা সমাধানের নামে কোন অবস্থাতেই শরীয়াহ অমান্য করা যাবে না।
কর্মসূচী:
১. আগামীকাল ১১ সেপ্টেম্বর শুক্রবার সকল বিভাগীয় শহরে প্রতিবাদ সমাবেশ ও বিক্ষোভ মিছিল।
মা’য়াসসালাম:
মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করিম (শায়েখ চরমোনাই)
সিনিয়র নায়েবে আমীর
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ



